রোজা ভঙ্গের কারণ: কী কী করলে রোজা ভাঙে, কী করলে ভাঙে না
সব মাজহাবে স্বীকৃত রোজা ভঙ্গের কারণ, ভুলে খেয়ে ফেললে কী করবেন, আর আধুনিক প্রশ্নগুলোর সতর্ক পর্যালোচনা: ইনজেকশন, ইনহেলার, চোখের ড্রপ, রক্ত পরীক্ষা।
এই গাইডে প্রচলিত মত ও সূত্র ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটি কোনো ফতোয়া নয়। আপনার নিজের পরিস্থিতির জন্য বিশ্বস্ত আলেম বা ইমামের কাছে জিজ্ঞাসা করুন।
রোজা ভঙ্গের বেশির ভাগ কারণ স্পষ্ট এবং সব মাজহাবে স্বীকৃত। কঠিন প্রশ্নগুলো সেসব, যেগুলোর মুখোমুখি আগের যুগের আলেমদের হতে হয়নি: ইনহেলার, চোখের ড্রপ, রক্ত পরীক্ষা, নিকোটিন প্যাচ। এই গাইড দুটোকে আলাদা করে দেখায়। এখানে বিভিন্ন মত তুলে ধরা হয়েছে, কোনো ফতোয়া দেওয়া হয়নি; যেখানে আলেমদের মত ভিন্ন, সেখানে তা বলা হয়েছে এবং নিজের অবস্থার জন্য আপনার আস্থাভাজন আলেম বা ইমামের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে।
সর্বসম্মত: এগুলোতে রোজা ভাঙে
রোজার কথা জেনে, ফজর থেকে মাগরিবের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে করলে:
- খাওয়া বা পান করা, যেকোনো কিছু, এমনকি অজুর সময় ইচ্ছাকৃতভাবে এক ঢোক পানি গিলে ফেলাও।
- স্ত্রী-সহবাস। এতে দিনটি কাজা করার পাশাপাশি কাফফারাও দিতে হয়: একটানা ষাট দিন রোজা, আর তা সম্ভব না হলে ষাটজন গরিবকে খাওয়ানো।
- ইচ্ছাকৃত বমি। যার অনিচ্ছায় বমি হয়ে যায় তার কিছু করতে হয় না; যে ইচ্ছা করে বমি করে তাকে দিনটি কাজা করতে হয় (আবু দাউদ ও তিরমিজি বর্ণিত)। এটি অধিকাংশ আলেমের অবস্থান।
- হায়েজ বা নিফাস দিনের যেকোনো সময় শুরু হলে, এমনকি মাগরিবের এক মিনিট আগেও। দিনটি পরে কাজা করতে হয় (সহিহ মুসলিম ৩৩৫)।
- মুখ বা নাক দিয়ে পুষ্টি হিসেবে পাকস্থলীতে যা পৌঁছায়, যেমন টিউবে খাওয়ানো, খাওয়ার সঙ্গে সাদৃশ্যের কারণে।
ধূমপানে রোজা ভাঙে বলে প্রায় সব আলেম একমত, কারণ ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে টেনে নেওয়া হয় এবং এর পদার্থ আছে।
সর্বসম্মত: এগুলোতে রোজা ভাঙে না
- ভুলে খাওয়া বা পান করা। নবী (সা.) বলেছেন রোজা পূর্ণ করতে, কারণ আল্লাহই খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন (সহিহ বুখারি ১৯৩৩; সহিহ মুসলিম ১১৫৫)। মনে পড়ামাত্র থেমে যান।
- নিজের থুতু গিলে ফেলা, বা কুলি করার পর মুখে লেগে থাকা খাবারের স্বাদ।
- অজুতে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া, বাড়াবাড়ি না করে।
- গোসল, সাঁতার (পানি না গিলে), সুগন্ধি, ডিওডোরেন্ট, লোশন, চোখের কাজল বা মেকআপ।
- দিনে স্বপ্নদোষ, বা গোসল ফরজ অবস্থায় ঘুম থেকে ওঠা: রোজা বহাল থাকে; গোসল করে রোজা চালিয়ে যান।
- ফজর পর্যন্ত রাতে খাওয়া: সীমা হলো সুবহে সাদিক, ইমসাকের লাইন নয়। দেখুন ইমসাক মানে কী।
- জিভের ডগায় খাবার চেখে ফেলে দেওয়া, যেমন রাঁধুনি লবণ দেখছেন; অধিকাংশের মতে জায়েজ, কারও মতে প্রয়োজন ছাড়া মাকরুহ।
আধুনিক প্রশ্ন: যেখানে আলেমদের মত ভিন্ন
আজকের বেশির ভাগ আলেম যে মূলনীতি প্রয়োগ করেন তা এই: রোজা ভাঙে পুষ্টি বা কোনো পদার্থ স্বাভাবিক পথে পাকস্থলীতে পৌঁছালে, অথবা সহবাসে। যা শরীরকে পুষ্টি না দিয়ে রক্তে পৌঁছায়, বা খাওয়ার পথ ছাড়া অন্য পথে ঢোকে, তাতে বেশির ভাগের মতে রোজা ভাঙে না। ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (OIC, জেদ্দা ১৯৯৭) এবং বিভিন্ন দেশের সংস্থা, বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ, এই ধারায় মতামত প্রকাশ করেছে। কিছু আলেম, বিশেষ করে হানাফি মাজহাবে, শরীরের ভেতরে যেকোনো কিছু প্রবেশ নিয়ে বেশি কঠোর। নিচের টেবিল একটি সারসংক্ষেপ; এটি ফতোয়া নয়।
| বিষয় | প্রচলিত অবস্থান | মন্তব্য |
|---|---|---|
| পুষ্টিবিহীন ইনজেকশন (টিকা, ইনসুলিন, অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক) | রোজা ভাঙে না (অনেক কাউন্সিল) | কিছু আলেম সতর্কতা হিসেবে দিনটি কাজা করার পরামর্শ দেন |
| পুষ্টিকর স্যালাইন, শিরাপথে খাবার, গ্লুকোজ | রোজা ভাঙে (অধিকাংশ) | খাওয়ার সঙ্গে সাদৃশ্য |
| রক্ত পরীক্ষা, রক্তদান | রোজা ভাঙে না (অধিকাংশ) | দুর্বলতার কারণে বেশি রক্তদান কেউ কেউ অপছন্দ করেন, হিজামার সঙ্গে সাদৃশ্যে |
| অ্যাজমার ইনহেলার (রিলিভার) | মতভেদ; অনেক কাউন্সিল: ভাঙে না | অন্যদের মতে ভাঙে, কারণ কণা পাকস্থলীতে পৌঁছাতে পারে। স্বাস্থ্য আগে; আলেমকে জিজ্ঞেস করুন |
| নেবুলাইজার | ভাঙার সম্ভাবনা বেশি (তরল কুয়াশা) | আলেমকে জিজ্ঞেস করুন |
| চোখের ড্রপ | ভাঙে না (অধিকাংশ) | হানাফি: স্বাদ পেলেও ভাঙে না; মালিকি: গলায় স্বাদ পৌঁছালে ভাঙে |
| কানের ড্রপ | ভাঙে না (অনেকের মতে, কানের পর্দা অক্ষত থাকলে) | হানাফিদের প্রচলিত মত: ভাঙে |
| নাকের স্প্রে, নাকের ড্রপ | মতভেদ | গলায় যা পৌঁছায় তা ফেলে দেওয়ার পরামর্শ |
| টুথপেস্ট | গিলে না ফেললে ভাঙে না; অনেকের মতে মাকরুহ | মিসওয়াক বা শুকনো ব্রাশ সবচেয়ে নিরাপদ |
| নিকোটিন প্যাচ, ত্বকের ক্রিম | ভাঙে না (অধিকাংশ) | ত্বক দিয়ে শোষিত হয়, খাওয়ার পথ নয় |
| সাপোজিটরি, এনিমা | মতভেদ | ধ্রুপদী আলেমদের অধিকাংশ: ভাঙে; কয়েকটি সমকালীন কাউন্সিল: ভাঙে না |
| দাঁতের চিকিৎসা, অবশ করার ইনজেকশন | কিছু না গিললে ভাঙে না | থুতু ফেলুন, রক্ত গিলবেন না |
| এন্ডোস্কোপি, গ্যাস্ট্রোস্কোপি | পিচ্ছিলকারক বা তরল ঢোকালে ভাঙে (প্রচলিত মত) | আলেম ও ডাক্তার দুজনকেই জিজ্ঞেস করুন |
| ডায়ালাইসিস | পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস: ভাঙে (পুষ্টি উপাদান); হিমোডায়ালাইসিস: মতভেদ | ডায়ালাইসিস রোগীরা ডাক্তার ও আলেম দুজনকেই জিজ্ঞেস করুন |
ধূসর এলাকার জন্য দুটি সাধারণ নিয়ম:
- স্বাস্থ্য আগে। দিনের বেলায় ওষুধ দরকার হলে নিন। কুরআন ২:১৮৪ ও ২:১৮৫ অসুস্থকে অব্যাহতি দিয়েছে; দিনটি কাজা করতে হবে কি না, সে প্রশ্ন পরে আসে, আর একটি দিন কাজা করা সহজ।
- সম্ভব হলে রোজার বাইরে সময় ঠিক করুন। অনেক ওষুধ সেহরি ও ইফতারে নেওয়া যায়। NHS এবং IDF-DAR Diabetes and Ramadan নির্দেশিকা দুটোই বলে, রমজানের আগে ডাক্তারের সঙ্গে ওষুধের পরিকল্পনা ঠিক করে নিন। দেখুন অসুস্থতায় রোজা।
রোজা ভেঙে গেলে
| যা ঘটেছে | যা করবেন |
|---|---|
| ভুল করে খেয়েছেন বা পান করেছেন, রাত আছে বা মাগরিব হয়ে গেছে ভেবে | হানাফি, শাফেয়ি, হাম্বলি: দিনটি কাজা করুন। কিছু আলেমের মতে যুক্তিসংগতভাবে যাচাই করে থাকলে কাজা লাগে না। আলেমকে জিজ্ঞেস করুন |
| ইচ্ছাকৃতভাবে খেয়েছেন | দিনটি কাজা করুন; তওবা করুন। হানাফিদের মতে ইচ্ছাকৃত খাওয়া বা পান করায় কাফফারাও দিতে হয় |
| সহবাস | দিনটি কাজা এবং কাফফারা |
| হায়েজ শুরু হয়েছে | দিনটি পরে কাজা করুন |
| অসুস্থতার কারণে ভাঙতে হয়েছে | সুস্থ হলে কাজা করুন |
একটি দিন ভেঙে গেলে বাকি মাস বাতিল হয় না। পরদিন স্বাভাবিকভাবে রোজা রাখুন। রোজা কাজা করার নিয়ম ও ফিদিয়া কীভাবে কাজ করে, তা আছে ছুটে যাওয়া রোজা, কাজা ও ফিদিয়া গাইডে। কারা রোজা রাখবেন ও দৈনন্দিন সুন্নতগুলো জানতে দেখুন রোজার মৌলিক বিষয়। আপনার দৈনিক সময় আছে রমজানের সময়সূচিতে।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্য। এখানে কোনো কিছুই আপনার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের জন্য ফতোয়া নয়, আর কোনো কিছুই চিকিৎসা পরামর্শ নয়; ওষুধের ব্যাপারে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
প্রয়োজনীয় টুল
প্রশ্নোত্তর
রোজার কথা ভুলে গিয়ে সকালে খেয়ে ফেলেছি। রোজা কি ভেঙে গেছে?
না। নবী (সা.) বলেছেন, কেউ ভুলে খেলে বা পান করলে সে যেন রোজা পূর্ণ করে, কারণ আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন (সহিহ বুখারি ১৯৩৩; সহিহ মুসলিম ১১৫৫)। মনে পড়ামাত্র থেমে যান এবং রোজা চালিয়ে যান।
দাঁত ব্রাশ করলে কি রোজা ভাঙে?
ব্রাশ করলে ভাঙে না, যদি টুথপেস্ট গিলে না ফেলেন। অনেক আলেম রোজায় টুথপেস্ট ব্যবহার মাকরুহ মনে করেন, এর স্বাদ ও গিলে ফেলার ঝুঁকির কারণে; শুকনো ব্রাশ বা মিসওয়াক ব্যবহার করলে প্রশ্নটাই থাকে না।
রোজা রেখে কি অ্যাজমার ইনহেলার নেওয়া যায়?
আলেমদের মত ভিন্ন। কয়েকটি ফিকহ কাউন্সিল ও অনেক সমকালীন আলেমের মতে রিলিভার ইনহেলারে রোজা ভাঙে না, কারণ এটি নগণ্য পদার্থের গ্যাস; অন্যদের মতে ভাঙে, কারণ এর কিছু অংশ পাকস্থলীতে পৌঁছায়। অ্যাজমা থাকলে স্বাস্থ্য নিয়ে ঝুঁকি নেবেন না: ইনহেলার নিন এবং দিনটি কাজা করতে হবে কি না, তা আপনার আস্থাভাজন আলেমকে জিজ্ঞেস করুন।
রক্ত পরীক্ষা বা টিকা নিলে কি রোজা ভাঙে?
ব্যাপকভাবে গৃহীত মত হলো, রক্ত নেওয়া এবং পুষ্টিবিহীন ইনজেকশনে (টিকা, ইনসুলিন, অ্যান্টিবায়োটিক) রোজা ভাঙে না। পুষ্টিকর স্যালাইন ও শিরাপথে খাবার দিলে সাধারণত ভাঙে বলে ধরা হয়। সন্দেহ এড়াতে চাইলে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন পরীক্ষাটি ইফতারের পর করা যায় কি না।
বমি হলে কী হবে?
নিজে থেকে বমি হয়ে গেলে রোজা ভাঙে না। ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে অধিকাংশের মতে ভাঙে, এবং সেই দিনটি কাজা করতে হয়।
সূত্র
- কুরআন ২:১৮৭
- সহিহ বুখারি ১৯৩৩; সহিহ মুসলিম ১১৫৫ (ভুলে খাওয়া বা পান করা)
- সহিহ মুসলিম ৩৩৫ (হায়েজ: রোজা কাজা করা)
- ইচ্ছাকৃত বমির হাদিস: আবু দাউদ ও তিরমিজি বর্ণিত
- NHS, রমজান ও রোজা বিষয়ক স্বাস্থ্য পরামর্শ (nhs.uk)
- IDF-DAR Diabetes and Ramadan Practical Guidelines